প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হয়? গবেষণা কী বলছে

সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখা অনেক পুরুষের দৈনন্দিন অভ্যাস। কিন্তু ফোনের বেতার তরঙ্গ ও তাপ কি শুক্রাণুর সংখ্যা, গঠন ও চলাচলের ক্ষমতায় প্রভাব ফেলে? গবেষণায় মিলেছে কিছু ইঙ্গিত, তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো সীমিত।
স্মার্টফোন এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কথা বলা, কাজ করা, ইন্টারনেট ব্যবহার কিংবা বিনোদন—সবকিছুতেই ফোনের ব্যবহার বাড়ছে। আর হাতের কাছে রাখার সুবিধার জন্য অনেকেই দীর্ঘ সময় প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখেন।
তবে এই সাধারণ অভ্যাস ঘিরে একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে—অণ্ডকোষের কাছাকাছি মোবাইল ফোন রাখলে কি শুক্রাণুর ক্ষতি হতে পারে? এতে কি পুরুষের প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে?
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনুসন্ধান চলছে। কিছু গবেষণায় সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সব গবেষণার ফলাফল এক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোন ব্যবহার বা পকেটে বহনের কারণে সরাসরি শুক্রাণুর ক্ষতি কিংবা বন্ধ্যত্ব হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
মোবাইল ফোনের তরঙ্গ কি শুক্রাণুর ক্ষতি করতে পারে?
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা বেতার তরঙ্গ নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত। এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের তুলনায় এর শক্তি কম। তবে এই তরঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ মানবদেহের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।
পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হলো শুক্রাণুর সংখ্যা, ঘনত্ব, গঠন, জীবিত থাকার হার এবং চলাচলের ক্ষমতা। এসব বৈশিষ্ট্য শুক্রাণুর গুণমান মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ।
২০২১ সালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৩৯টি গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করা হয়। এতে পরীক্ষাগারে শুক্রাণুর ওপর বেতার তরঙ্গের সম্ভাব্য প্রভাব এবং প্রাণীদের ওপর পরিচালিত কিছু পরীক্ষায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণার সম্মিলিত ফলাফল থেকে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সঙ্গে শুক্রাণুর গুণমান কমে যাওয়ার সুস্পষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
২০২৪ সালের আরেকটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনাতেও মোবাইল ফোনের সংস্পর্শ ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা উঠে আসে।
অর্থাৎ, সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা থাকলেও মোবাইল ফোনের বেতার তরঙ্গ মানুষের শুক্রাণুর ক্ষতি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো অপর্যাপ্ত।

সামনের পকেটে ফোন রাখলেই কি ঝুঁকি বাড়ে?
প্যান্টের সামনের পকেটে মোবাইল ফোন রাখলে সেটি অণ্ডকোষের কাছাকাছি থাকে। ফলে ফোনের বেতার তরঙ্গ ও তাপের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কিন্তু ফোন শরীরের কাছে থাকলেই শুক্রাণুর ক্ষতি হবে, এমনটি বলা যায় না। ফোনের নির্গত শক্তি, ব্যবহারের ধরন, সংস্পর্শের মাত্রা এবং অন্যান্য শারীরিক ও পরিবেশগত বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
২০২৪ সালের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় সামনের পকেটে ফোন বহনের সঙ্গে শুক্রাণুর ঘনত্ব, মোট সংখ্যা, গঠন, চলাচলের ক্ষমতা এবং গর্ভধারণে প্রয়োজনীয় সময়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রমাণকে অনিশ্চিত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। গবেষণাগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তাই পকেটে ফোন রাখাকে সরাসরি বন্ধ্যত্বের কারণ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়। তবে দীর্ঘ সময় ফোন পকেটে রাখার প্রয়োজন না হলে সেটি ব্যাগে বা শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখা যেতে পারে।
ফোনের তাপ কি শুক্রাণুর জন্য ক্ষতিকর?
শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য অণ্ডকোষের তাপমাত্রা শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার তুলনায় কিছুটা কম থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শে থাকলে শুক্রাণু উৎপাদন ও গুণমান প্রভাবিত হতে পারে।
এ কারণে নিয়মিত অতিরিক্ত তাপের সংস্পর্শ, দীর্ঘক্ষণ গরম পরিবেশে থাকা এবং এ ধরনের অন্যান্য পরিস্থিতি পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় গুরুত্ব পায়।
তবে পকেটে মোবাইল ফোন রাখার ফলে অণ্ডকোষের তাপমাত্রা এতটা বেড়ে যায় যে শুক্রাণুর ক্ষতি হয়, এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—ফোন গরম হওয়া আর সেই তাপের কারণে প্রজননস্বাস্থ্যে ক্ষতি হওয়া এক বিষয় নয়। ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে না রেখে ঠান্ডা হতে দেওয়া উচিত।
শুক্রাণুর গুণমান কমে যাওয়ার পেছনে আর কী কারণ রয়েছে?
শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, চলাচলের ক্ষমতা দুর্বল হওয়া কিংবা গঠনে অস্বাভাবিকতা থাকলে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। তবে বীর্য পরীক্ষার কোনো একটি সূচক অস্বাভাবিক হলেই একজন পুরুষকে বন্ধ্যত্বে আক্রান্ত বলা যায় না।
পুরুষের প্রজননক্ষমতা বিভিন্ন কারণে প্রভাবিত হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে-
1. ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার;
2. অতিরিক্ত মদ্যপান;
3. স্থূলতা ও কিছু বিপাকীয় সমস্যা;
4. নির্দিষ্ট সংক্রমণ ও হরমোনজনিত সমস্যা;
5. অণ্ডকোষের কিছু রোগ;
6. নির্দিষ্ট ওষুধের ব্যবহার এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা।
এ ছাড়া বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও জীবনযাপনের অভ্যাসও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তান ধারণে সমস্যা হলে শুধু মোবাইল ফোনকে দায়ী না করে সম্ভাব্য সব কারণ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

শুক্রাণুর স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কী করবেন?
মোবাইল ফোনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে গবেষণা চললেও সামগ্রিক প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে কিছু অভ্যাস সহায়ক হতে পারে।
ফোন শরীর থেকে কিছুটা দূরে রাখুন: দীর্ঘ সময় পকেটে ফোন রাখার প্রয়োজন না হলে ব্যাগে বা অন্য কোনো নিরাপদ স্থানে রাখতে পারেন। তবে এতে শুক্রাণুর গুণমান বাড়ে বা বন্ধ্যত্ব প্রতিরোধ হয়—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলুন: ফোন অস্বাভাবিক গরম হয়ে গেলে সেটি শরীরের সঙ্গে চেপে রাখবেন না। প্রয়োজন হলে ব্যবহার বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দিন এবং প্রস্তুতকারকের নিরাপত্তানির্দেশনা অনুসরণ করুন।
ধূমপান ত্যাগ করুন: ধূমপান শুক্রাণুর গুণমান ও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ধূমপান এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করুন: সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
নিজে থেকে সাপ্লিমেন্ট খাবেন না: শুক্রাণুর সংখ্যা বা গুণমান বাড়ানোর দাবি করা সব সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা প্রমাণিত নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এগুলো ব্যবহার করা উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও এক বছর গর্ভধারণ না হলে দম্পতির উভয়েরই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে সাধারণত ছয় মাস চেষ্টা করার পর মূল্যায়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। আগে থেকেই প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা জানা থাকলে আরও আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে।
পুরুষের ক্ষেত্রে সিমেন অ্যানালাইসিস বা বীর্য পরীক্ষার মাধ্যমে শুক্রাণুর সংখ্যা, চলাচলের ক্ষমতা ও গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক হরমোন পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
শুধু পকেটে মোবাইল ফোন রাখার কারণে বীর্য পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক নয়। তবে সন্তান ধারণে সমস্যা হলে কিংবা প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।



