মোদি সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ অভিজিৎ দীপকে, ভোটার তালিকা ইস্যুতে উত্তপ্ত ভারতের রাজনীতি

ভারতে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে কটাক্ষের জবাবে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়ে আলোচনায় আসা অভিজিৎ দীপকে এবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তিনি। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তাঁকে এবং তাঁর সংগঠনের আরও দুই নেতাকে আটক করে পুলিশ।
৩১ বছর বয়সী দীপকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরে বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির দাবিতে সংগঠনটি তরুণদের প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে দেশজুড়ে পরিচিতি
চলতি বছরের মে মাসে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। এর জবাবে দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দেন। সেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, সব তেলাপোকা একসঙ্গে হলে কী ঘটতে পারে।
পোস্টটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি অনুসারী অর্জন করে। পরে অনলাইন প্রচারের পাশাপাশি বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজপথেও প্রতিবাদ শুরু করে সংগঠনটি।
যুক্তরাষ্ট্রে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে ভারতে ফেরেন দীপকে। তাঁর দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা তাঁকে জনস্বার্থে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে। তবে আন্দোলনের কারণে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা হুমকির মুখেও পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন, মন্ত্রীকে ঘিরে বিতর্ক
চলতি বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ এবং প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনে প্রতিবাদে অংশ নেয় দীপকের সংগঠন। এ ঘটনায় ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে তারা।
সরবরাহ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সমালোচনা ও চাপের মধ্যে গত ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। তবে এ দাবির সত্যতা প্রকাশের আগে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
এরপর থেকে দীপকে ও তাঁর সমর্থকেরা সরকারি স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে প্রচার চালিয়ে আসছেন।
সংগঠনটি নিজেদের প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা একটি চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নতুন বিতর্ক
সম্প্রতি ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে সিজেপি। বিরোধীদের অভিযোগ, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন দীপকে ও তাঁর সমর্থকেরা।
অন্যদিকে, সরবরাহ করা প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হিসেবে বলা হয়েছে, তালিকা যাচাই ও সংশোধনের সময় বিভিন্ন ধরনের এন্ট্রি চিহ্নিত হওয়ায় এ সংখ্যা তৈরি হয়েছে। ভুলভাবে কারও নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন বলেও কমিশন জানিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তার উদ্বেগ প্রকাশের খবর সামনে আসার পর বিতর্ক আরও জোরালো হয়।
তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।
দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা, আটক বিক্ষোভকারীরা
শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। এ সময় বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করার খবর পাওয়া যায়।
দিল্লিতে পৌঁছানোর পর দীপকের সঙ্গে সংগঠনটির আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানাকেও আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দীপকে। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আদর্শ অনুসরণের কথাও বলেছেন।
বিমানে ওঠার আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দীপকে বলেন, সামনে কী ঘটবে, তা তিনি জানেন না। তবে ভয় পেয়ে পিছু হটবেন না এবং গণতন্ত্র রক্ষায় আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
তরুণদের সমর্থন কতটা প্রভাব ফেলবে রাজনীতিতে?
বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা—এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে আন্দোলন চালাচ্ছে সিজেপি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটির পরিচিতি বাড়ার পাশাপাশি রাজপথে সক্রিয়তাও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে অনলাইন জনপ্রিয়তা কতটা দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থনে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে সংগঠনটির ধারাবাহিক কর্মসূচি, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের ওপর।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক ও তরুণদের বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এই আন্দোলন ভবিষ্যতে কতটা বিস্তৃত হবে এবং সরকারের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়।



